মধু খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা

মধু হল এক প্রকারের মিষ্টি ও ঘন তরল পদার্থ, যা মৌমাছি ও অন্যান্য পতঙ্গ ফুলের নির্যাস হতে তৈরি করে এবং মৌচাকে সংরক্ষণ করে রাখে। মধু উচ্চ ঔষধিগুণ সম্পন্ন একটি ভেষজ তরল এবং মধু সুপেয়। বিভিন্ন খাদ্য প্রস্তুতিতে মধুর ব্যবহারে চিনির চেয়ে এর অনেক সুবিধা রয়েছে। এর বিশিষ্ট গন্ধের জন্য অনেকে চিনির চাইতে মধুকেই পছন্দ করেন।

মধুতে রয়েছে কার্বোহাইড্রেট, প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, মিনারেল ও আন্টি অক্সিডেন্ট যা আমাদের ইমিউনিটি বজায় রাখতে সাহায্য করে। শরীরে তাপ উৎপাদনে সাহায্য করে এবং ঠান্ডাজনিত অসুখ থেকে রক্ষা করে। সর্বোপরি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে থাকে।

মধু খাওয়ার নিয়মঃ

মধু খাওয়ার বিশেষ তেমন কোন নিয়ম নেই। তবে অবশ্যই নিয়মিত মধু পান সর্বোত্তম৷ এতে শরীরের ইমিউনিটি সিস্টেম অনেক শক্তিশালী হবে এবং যে উপকারিতাগুলি পাবেন সেগুলিও খুবই দৃশ্যমান হবে। আপনি পূর্বের থেকে অবশ্যই ভালো অনুভব করবেন। তাই, নিম্নোক্ত বর্ণনায় আমাদের দেশে বহুল ব্যবহৃত মধু খাওয়ার নিয়ম গুলি তুলে ধরছিঃ

(১)প্রতিদিন সকালে ১-২ চা চামচ মধু সরাসরি খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন। এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী হবে।

(২)মধু শরীরের ওজন কমাতে অনেক কার্যকরী। প্রতিদিন সকালে কুসুম গরম পানির সাথে ১-২ চা চামচ মধুর সঙ্গে হালকা লেবুর রস মিশিয়ে খালি পেটে পান করে নিবেন। এতে আপনার শরীরের মেদ কমে যাবে।

(৩) কাঁচা ছোলার ভিজিয়ে রেখে এর সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে শারীরিক দুর্বলতা দ্রুত কমে যাবে।

(৪) ব্রেড বা রুটির সাথে জেলি কিংবা নসিলা এর পরিবর্তে মধু খান। এটি খেতে বেশ সুস্বাদু এবং অধিক এনার্জীও পাবেন।

(৫) চায়ের সাথে চিনি এর পরিবর্তে মধু পান করতে পারেন। চিনিকে বলা হয়ে থাকে ‘হোয়াইট পয়জন’ যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। 

(৬) দুধের সঙ্গে মধু মিশিয়ে পান করুন। এটি খুবই উত্তম একটি পানীয়। তবে, অবশ্যই দুধ গরম থাকা অবস্থায় এতে মধু দিবেন না। তাপমাত্রা স্বাভাবিক হলে তখন মধু মিশিয়ে খেয়ে নিবেন।

(৭) আমরা জানি কালোজিরা হল সকল রোগের মহা ঔষধ। তাই, অল্প পরিমান কালজিরার সাথে ১ চা চামচ মধু নিয়মিত পান করুন। ফলে, অনেক জটিল রোগ থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন, ইনশা-আল্লাহ।

(৮) মধু ও লেবুর শরবত খুবই উত্তম পানীয়। মধুতে বিদ্যমান খাদ্য উপাদানগুলি শরীরে তৎক্ষণাৎ শক্তি যোগান দেয় এবং শরীরের ক্লান্তি দূর করে।

(৯) যারা কোষ্ঠকাঠিন্যতায় ভুগছেন তারা ১ মগ পানিতে ২ চা চামচ ইসুফগুলের ভুসি এবং ১ চা চামচ মধু মিশিয়ে খালি পেতে কয়েকদিন পান করলে ভাল সুফল পাবেন।

(১০) যারা রক্তনালীর বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য মধু বিশেষ উপকারী। মধুর সঙ্গে দারচিনির গুঁড়ো মিশিয়ে নিয়মিত কিছুদিন খেতে নিতে পারেন। এতে আপনার রক্তনালীর সমস্যা দূর করবে এবং রক্তে বিদ্যমান খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ প্রায় ১০ ভাগ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে খাঁটি মধু।

(১১) সর্দি-জ্বর নিরাময়ের জন্য তুলসি পাতা বা বাসক পাতার রসের সঙ্গের মধু মিশিয়ে খেতে পারেন। এতে খুবই ভাল কার্যকারিতা অনুভব করবেন। 

(১২) রান্নায় সরাসরি মধু ব্যাবহার করা যাবে না। খাবারে মধু মিশিয়ে মিষ্টি করতে রান্না শেষ হবার পরে তাতে মধু মিশিয়ে নিন।

(১৩) ফুটন্ত পানি কিংবা দুধে সরাসরি মধু যোগ করা যাবে না। পানি বা দুধ পানযোগ্য তাপমাত্রায় আসলে তারপর এতে মধু যোগ করুন। 

(১৪) যেসকল বাচ্চাদের বয়স ১ বছর বা ১২ মাসের কম, তাদের কোন ক্রমেই মধু খেতে দেয়া যাবে না। কারণ ১ বছরের কম বয়সে বাচ্চাদের পরিপাকতন্ত্র পুরোপুরি সুগঠিত থাকে না। বাচ্চার বয়স ১২ মাস হওয়ার পরে, দৈনিক অল্প পরিমাণে মধু খাওয়ানোর অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে।

মধু খাওয়ার উপকারিতাঃ

সুস্থ থাকতে নিয়মিত খাঁটি মধু খাওয়ার কোন বিকল্প নেই। ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি মধুতে কি কি খাদ্য উপাদানসমূহ বিদ্যমান রয়েছে। তবে আমাদেরকে নিয়মিত মধু খাওার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। 

তাহলেই, মধুতে বিদ্যমান এই বিশেষ খাদ্য উপাদানগুলি আমাদের শরীরে বিশেষ প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে । আমরা সবসময় মধু নিয়মিত খাওয়ার কথা বলে থাকি কারণ, অনিয়মিত মধু পানে যে উপকার আপনি পাবেন তা তেমনভাবে পরিলক্ষিত হবেনা । এ পর্যায়ে খাঁটি মধুর উল্লেখযোগ্য উপকারিতাসমূহ নিম্নে সংক্ষেপে তুলে ধরছিঃ

(১)মধুতে বিদ্যমান রয়েছে বিভিন্ন প্রাকৃতিক অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। এর ফলে নিয়মিত খাঁটি মধু পানে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি হয়। 

(২)মধু আমাদের শরীরে তৎক্ষনাৎ শক্তির যোগান দেয়, শারীরিক দুর্বলতা দূর করে থাকে এবং শরীরে তাপ উৎপন্ন করে।

(৩)মধু আমাদের শরীরে খাবারের হজমশক্তি বৃদ্ধিতে বিশেষভাবে সহায়তা করে। 

(৪)যারা রক্তশূন্যতায় ভুগছেন, মধু তাদের জন্য অত্যন্ত উপকারি। রক্তে হিমোগ্লোবিন এর পরিমাণ বৃদ্ধিতে সহায়তার মাধ্যমে মধু শরীরের রক্তশূণ্যতা দূর করে।

(৫)মধু আমাদের শরীরে রক্তনালী প্রসারণের মাধ্যমে হৃদপেশির কার্যক্রমে বিশেষ ভূমিকা রাখে এবং শরীরে রক্ত সঞ্চালনে সহায়তা করে।

(৬)মধুতে রয়েছে বিভিন্ন খনিজ উপাদানসমূহ। নিয়মিত মধু পানে আমাদের শরীরে এসব খজিনের (কপার, লৌহ, ম্যাঙ্গানিজ ইত্যাদি) অভাব পূরণ হয়। 

(৭)মুখের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ঘায়ের চিকিৎসায় মধু খুবই কার্যকরী এবং মধু আমাদের দাঁতকে মজবুত করে।

(৮)মৌসুমি সর্দি, জ্বর উপশমে তুলসি পাতার রসের সঙ্গে খাঁটি মধু মিশিয়ে কয়েকদিন নিয়মিত পান করলে এটা দারুণভাবে কাজ করে।

(৯)যারা ফুসফুসের বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন এমনকি যাদের ফুসফুস করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ তাদের জন্যও মধু খুবই কার্যকরী। 

(১০)মধু শিশুদের হাড়ের গঠন মজবুত করে, দৃষ্টিশক্তি এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে।

(১১)রাতের বেলা দুধের সঙ্গে মধু মিশিয়ে পান করলে আপনার অনিদ্রা দূর করতে সাহায্য করবে। শারীরিক এবং যৌন দূর্বলতা দূরীকরণে মধুর রয়েছে বিশেষ ভূমিকা।

(১২)মধু পানে শরীরের কোষ্ঠকাঠিন্যতা দূর হয়। নিয়মিত মধু পান বাতের ব্যথা উপশম করে।

(১৩)মধুতে বিদ্যমান অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বকের রং সুন্দর করে এবং তারুণ্যতা বজায়ে রাখতে সহায়তা করে।

(১৪)মুখের ব্রণ এর চিকিৎসায়, ত্বক এবং চুলের রূপচর্চায় মধু ব্যবহারে বিশেষ সুফল পাওয়া যায়।

মধু খাওয়ার অপকারিতাঃ

(১)শিশুদের বটুলিজম: ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধু দেওয়া উচিত নয়। মধুতে কিছুটা ধূলিকণা রয়েছে যা ব্যাক্টেরিয়ার স্পোর বহন করতে পারে। শিশুদের জীবাণু প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে, যার ফলে তারা খুব সহজেই অসুস্থ হয়ে যায়।

(২)এলার্জি: মধুতে পরাগায়নের ফলে এলার্জির সৃষ্টি হতে পারে। তাজ যাদের এলার্জির সমস্যা আছে তারা মধু গ্রহণে সতর্ক থাকবেন।

(৩)ওজন বৃদ্ধি হালকা গরম জল বা লেবুর রসের সাথে মধু মিশিয়ে খেলে তা ওজন হ্রাসকে উৎসাহ করে, তবে অতিরিক্ত পরিমানে খেলে তা বিপরীতে কাজ করতে পারে।

অতিরিক্ত মধু বেশি খেলে কী হয়?

নিয়মিত এবং পরিমাণ মতো মধু খাওয়া ভালো। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মধু খাওয়া শরীরের জন্য খারাপ। নিয়মিত মধু খেলে পাকস্থলিতে গ্লুকোজ তৈরি হয় যা সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আর এটা আমাদের শরীরের জন্য খুবই খারাপ।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ জন্মের পর অনেকই বাচ্চার মুখে মধু দেয় কিন্তু এটা কোনোভাবেই উচিত না। মধুর অনেক স্বাস্থ্যকর হলেও এক বছরের নিচের বাচ্চাকে মধু খাওয়ানো উচিত না। ডায়াবেটিক রোগীর মধু খাওয়ার ব্যাপারে ডাক্তারর পরামর্শ নেয়া আবশ্যক নিয়ম মেনে সঠিক উপায়ে সঠিক পরিমাণে মধু গ্রহণ করলে আপনি উপকৃত হবেন।

Leave a Comment