বুকে চাপ হলে করণীয়

বুকে ব্যাথা হলেই আমরা সবার আগে ভেবে নেই যে,  আমার হার্ট এ্যাটাক হয়নি তো! তবে বুকব্যথা সবসময় হার্ট এ্যাটাক বা হৃদরোগের লক্ষণ এমন কিছু নয়। তারপরও এটিকে অবহেলা করা ঠিক হবে না।

কিন্তু আমরা কখন বুঝবো বুকব্যথা হার্ট এ্যাটাকের কারণে নয়, আর কখন বুঝবো হার্ট এ্যাটাকের কারণে সে বিষয়ে আমাদের সবারই সচেতন হতে হবে। আমেরিকায় প্রতিবছরে প্রায় ৫০ লক্ষাধিক মানুষ বুকের ব্যথা নিয়ে হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে যান। আমাদের দেশে যদিও এর সঠিক পরিসংখ্যান করা হয়নি তবু এই সংখ্যা নেহায়েত কম হবে না।

পূর্ণ বয়স্ক মানুষের বুকব্যথার কারণ

একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের বুক ব্যথার সবচেয়ে প্রধান কারণ হচ্ছে গ্যাস্ট্রোইনটেসটিনাল- ৪২% (গ্যাস, পাকস্থলী ও অন্ত্রের রোগ )।

শিশুদের বুকব্যথার প্রধান কারণ

শিশুদের ক্ষেত্রে বুক ব্যথার মূল কারণ হচ্ছে মাংস ও হাড়জনিত রোগ। বুকে ব্যথায় অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- 

  • ফুসফুসের রোগ। যেমনঃ নিওমোনিয়ায়, যক্ষ্মা, ফুসফুসের ক্যান্সার। 
  • হৃদরোগ – ৩১%। যেমনঃ হার্ট এ্যাটাক। 
  • মাংসপেশী ও হাড়জনিত রোগ। যেমনঃ অস্টিওআর্থাইটিস। 

কিভাবে বুঝবেন বুকে ব্যথা হৃদরোগ জনিত

হৃদরোগের বা হার্ট অ্যাটাক এর কারণে বুকে ব্যথা হচ্ছে কিনা তা সবসময় পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারা যায় না। কিন্তু ব্যাথার ধরন ও অন্য কিছু উপসর্গ দেখে সবমিলিয়ে মোটামুটি ধারণা করা যায়।

  • তীব্র ব্যথা হওয়া। ব্যথার ফলে রোগী যখন বলবে যে, তার বুক ভারী লাগছে। তার বুকে চাপ লাগছে। সাধারণত ব্যাথা বুকের বাঁ দিকে হয়ে থাকে। তবে কখনো আবার বুকের মাঝখানে ও ডান দিকেও হতে পারে। হার্ট এ্যাটাক হলে সবসময় যে ব্যথা থাকে তাও নয়, গবেষণায় পাওয়া গেছে যে, যতো রোগী হার্ট এ্যাটাকে আক্রান্ত হয় তার প্রায় তিনভাগের একভাগের বুকে ব্যাথা থাকে না।
  • বুকের ব্যাথার সাথে শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে।
  • শরীর ঘেমে যাওয়া।
  • রোগীর বমি বমি ভাব হওয়া।
  • বাম হাত, বাম দিকের ঘাড় ও থুতনিতে ব্যথা হওয়া। বুকে ব্যথাসহ উপরোক্ত লক্ষণগুলো থাকলে হার্ট এ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি বলে মনে করে নিতে হবে।

হার্ট এ্যাটাকজনিত বুকের ব্যাথা কতোক্ষণ থাকে ? বুকে ব্যাথা কোথায়, কিরকম তা বুঝার পাশাপাশি এর ব্যাপ্তিকালও খুব গুরুত্বপূর্ণ হার্ট এ্যাটাকজনিত বুকব্যথা কয়েকমিনিট ধরে আসে এবং ধীরে ধীরে তা আরও কঠিনভাবে তীব্রতর হয় থাকে। হঠাৎ করে তা আসে না। 

এমন ব্যাথা কমপক্ষে ৫ মিনিট স্থায়ী হয়। ব্যাথা কখনো ২০ থেকে ৩০ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ব্যাথা যদি শারীরিক কোনো কাজ করার সময় হয় এবং বিশ্রামে তা সেরে না যায় তবে এটা অনেকটাই হার্ট এ্যাটাককে ইঙ্গিত করে।

কিভাবে বুঝবেন বুকব্যথা হার্ট এ্যাটাকের জন্য নয়

  • অল্প সময় (কয়েক সেকেন্ড)। ছুরি দিয়ে আঘাত করার মতো ব্যথা অনুভূত হওয়া।
  • বুকের ব্যাথা যদি ঘণ্টাব্যাপী থাকে। 
  • ব্যথা যদি হাত দিয়ে চাপ দিলে বাড়ে। তবে ধরে নিতে হবে যে, ব্যাথা মাংসপেশী বা হাড় সংক্রান্ত কোনো কারণে হচ্ছে। 
  • ব্যথা যদি আপনি একটি আঙুল দিয়ে চিহ্নিত করতে পারেন। হৃদরোগের ব্যথা সাধারণত একটি আঙুল দিয়ে চিহ্নিত করা যায় না।

বুকে বিভিন্ন ব্যথা অনুভবের কারণ

বুকে বিভিন্ন কারণে চাপ অনুভব হতে পারে। যেমনঃ শ্বসনতন্ত্রের কারণে চাপ অনুভূত হতে পারে। শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি, শ্বাসনালির প্রদাহ, সিওপিডি, ফুসফুস ঝিল্লির প্রদাহ ও বাতাস জমা, ফুসফুসে পানির আধিক্য, ফুসফুসে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, শ্বাসনালিতে কোনো কিছু ঢুকে গেলে। আরও যেসব কারণে এ সমস্যা হয়ে থাকে, সেগুলো হচ্ছে-

  • হৃদযন্ত্রের কারণে : বুক ধড়ফড়, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, জন্মগত হৃদযন্ত্রের ত্রুটি, হৃদযন্ত্রের রক্তনালি সংকোচিৎ হওয়া ইত্যাদি।
  • রক্তনালির সমস্যায় : মহাধমনির দেয়াল ছিঁড়ে গেলে (অ্যায়োরটিক ডিসেকশন), মহাধমনির দেয়াল প্রসারিত হলে (অ্যায়োরটিক অ্যানুরিজম)।
  • খাদ্যনালির সমস্যা : খাদ্যনালির নিচের অংশ চিকন হয়ে যাওয়া, খাদ্যনালির সংকোচন, বুকজ্বালা, খাদ্যনালির প্রদাহ।
  • বুকের হাড়ে সমস্যা : অতিরিক্ত ব্যথার ওষুধ সেবন, দুশ্চিন্তা, উৎকণ্ঠা এবং উদ্বেগ থেকে অনুভূত হতে পারে বুকে অস্বস্তিকর চাপ।
  • রোগের ধরন : চাপবোধ করা, ব্যাথা হওয়া, ভারী লাগা, খোঁচা মেরে ধরা ইত্যাদি। এ ধরনের সমস্যা কখনো বেশি হয়ে থাকে। খাবার গ্রহণের সঙ্গেও সম্পর্ক থাকতে পারে। মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তায় আক্রান্তের কারণেও হয়ে থাকে।

যা জানা জরুরি – আক্রান্ত ব্যক্তির পেশাগত ইতিহাস, পোষাপ্রাণী পালনের ইতিহাস এগুলো জানতে হবে। রোগীর ধূমপান, মদ্যপান এবং পান-সুপারি বা জর্দা খাওয়ার সম্পর্কে জানতে হবে। রোগীর সাধারণ, শ্বাসতন্ত্র এবং হৃদযন্ত্রের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। রোগ সুচারুভাবে নির্ণয় করার জন্য শারীরিক পরীক্ষা ছাড়াও কিছু রুটিন দিয়ে রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যেতে পারে।

চিকিৎসা – আক্রান্ত ব্যক্তির সঠিক রোগ নিরূপণের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। পান খাওয়া, ধূমপান করা বা মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে তা ছেড়ে দিতে হবে। কোনো পোষাপ্রাণী পালন বা পেশাগত কারণে যদি ওই সমস্যা হয়ে থাকে, তা পরিবর্তন করার জন্য পরামর্শ দিতে হবে।

রোগীকে উপযুক্ত স্বাস্থ্য শিক্ষা দিতে হবে এবং প্রয়োজনে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের কাছে থেকে পরামর্শ নিতে হবে। কারণ বুকে চাপবোধ করা একটি সাধারণ উপসর্গ মনে হলেও এর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে প্রাণঘাতী কোনো ধরনের মারাত্মক রোগ। রোগীর মানসিক সমস্যার কারণে ওই সমস্যার সৃষ্টি হলে তার উপযুক্ত চিকিৎসা এবং তাকে আশ্বস্ত করা যেতে পারে।

আশা করি উপরোক্ত তথ্যসমূহ আপনাদের ভালো লেগেছে। পোস্টটি থেকে আপনি যদি উপকৃত হয়ে থাকেন তাহলে অবশ্যই আপনাদের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং তাদেরকেও এই তথ্যগুলো থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ করে দিন। শেষ পর্যন্ত থাকার জন্য ধন্যবাদ।

Leave a Comment