ফুরাত নদী কোথায় অবস্থিত

ফোরাত নদী (আরবি ভাষায়ঃ نهر الفرات নাহ্ উল্-ফুরাত, তুর্কি ভাষায়: Firat , বাংলায় ফোরাত বলা হয়। ফোরাত নদী দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার একটি নদী। এটি তুরস্কতে উৎপত্তি লাভ করে সিরিয়া ও ইরাকের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর দজলা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে এবং শাত আল আরব নামে পারস্য উপসাগরে পতিত হয়েছে।

প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতাগুলি বিকাশ লাভ করেছিল ফোরাত ও দজলা নদীর পানি ব্যবহার করেই। গ্রিক নাম মেসোপটেমিয়া এই স্বাক্ষরই বহন করছে, শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে “দুই নদীর মাঝে”। এই স্থানেই প্রাচীন সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয় এবং আসিরিয় সভ্যতাগুলি বিকাশ লাভ করেছিল।

ফোরাত নদীটি ২,৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এর অববাহিকার আয়তন হলো প্রায় ৪,৪০,০০০ বর্গকিলোমিটার। এর মোট অববাহিকার সর্বমোট মাত্র ৩০% তুরস্কতে অবস্থিত হলেও এর পানির ১০%-এর উৎস তুরস্কের উচ্চভূমিতে অবস্থিত।

তুরস্কের কোরাসুয়ু নদী, মুরাত নদী এবং আরও অনেকগুলি নদীর পূর্ব মধ্য তুরস্কে এলাজিগ-এর কাছে মিলিত হওয়ার পর ফোরাত নদীর ঊর্ধ্ব অংশ গঠন করেছে। অতঃপর নদীটি আলাব শহরের ১২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সিরিয়াতে প্রবেশ করেছে। পূর্ব সিরিয়াতে দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্ক থেকে আগত খাবুর নদী নামের একটি প্রধান উপনদী এর সাথে মিলিত হয়েছে।

ফোরাত নদীর গতিপথ প্রধানত দজলা নদীর সমান্তরাল। নদী দুটি ইরাকে প্রবেশ করার পর একে অপর থেকে সর্বোচ্চ ১০০ মাইল দূরত্ব বজায় রেখে পাশাপাশি অগ্রসর হয়েছে। উত্তর ইরাকে ফোরাত নদী আল-জাজিরাহ নামের অঞ্চলের পশ্চিম সীমান্ত গঠন করেছে এবং তাইগ্রিস নদী এর পূর্ব সীমান্ত গঠন করেছে।

একসময় দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকে এই দুটি নদীর মধ্যবর্তী অববাহিকা এলাকাটিতে প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতা অবস্থান করতো। তাইগ্রিস থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরত্বে এসে ফোরাত নদী দুইটি শাখায় ভাগ হয়ে গেছে। এই শাখা দুইটি ১৮০ কিলোমিটার পরে আবার একত্রিত হয়েছে। এরপর ফোরাত ও দজলা-কুরনাহ শহরের কাছে মিলিত হওয়ার পর শাত আল আরব নদী গঠন করেছে এবং পারস্য উপসাগরে পতিত হয়েছে।

ফোরাতনদী প্রতিবছর ২৮০০ কোটি ঘনমিটার পানি বহন করে থাকে। এপ্রিল ও মে মাসে পানি ধারণের পরিমাণ সর্বোচ্চ হয়ে থাকে। ফোরাত নদীর উপর অবস্থিত প্রধান শহরগুলি হলো সিরিয়ার রাকাহ ও দাইর আজ জর এবং ইরাকের কারবালা, হিল্লাহ এবং নাজাফ ইত্যাদি।

ইউফ্রেটিস বা ফোরাত শুধু এক নদীর নাম নয়, বরং একটি ইতিহাস যা পুরাণ আর স্বপ্নে ঘেরা এক সত্তা। ইউফ্রেটিস আর টাইগ্রিসের তীরেই বাইবেলে বর্ণিত গার্ডেন অব ইডেন অবস্থিত।

ভারতের জন্য যা গঙ্গা সভ্যতার দোলনা, মেসোপটেমিয়ার জন্য ইউফ্রেটিসও ঠিক তাই। কাল, সময় এবং ইতিহাসের সাক্ষী ফোরাতের এই দীর্ঘ ২ হাজার ৭৬০ কিলোমিটার নদী। ইউফ্রেটিস তৈরি হয়েছে দুটো নদীর মিলনের ফলে। প্রথমটি কারা-সু, যার উদ্ভব তুরস্কের পূর্বাঞ্চলে হয়েছিল এবং অন্যটি হচ্ছে মুরাত-সু যা আগত হয়েছে আরারাত পর্বত থেকে। ইউফ্রেটিস তুরস্কের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার পথ। 

অতঃপর এটি প্রবেশ করেছে সিরিয়ায় এবং শেষমেশ ইরাকে। বসরার শাত আল আরবে এসে ইউফ্রেটিস যুক্ত হয়েছে টাইগ্রিস বা দজলা নদীর সাথে এবং এখান থেকে টাইগ্রিস গিয়ে মিলিত হয়েছে পারস্য উপসাগরে। এ অঞ্চলে ইউফ্রেটিস হচ্ছে একটি সীমান্ত অঞ্চল। 

একসময় এ নদীটি পারসিক সাম্রাজ্যকে পূর্ব ও পশ্চিম অংশে বিভক্ত করেছিল। ইউফ্রেটিস পেরিয়ে এ অঞ্চলের একটি প্রচীন কথা প্রচলিত রয়েছে। একসময় এই নদী রোমান সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্ত হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রাচীন পারস্যের মানুষগুলো এ নদীকে উফরাতু নামে ডাকত। বারো শতকের দিকে ভূগোলবিদ ইয়াকুত আল-হামাবি তার বিখ্যাত গ্রন্থ মুজাম আল বুলদানে ইউফ্রেটিস নদীর একটি বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন।

ইউফ্রেটিস নামটি নিয়েও তিনি তার ব্যাখ্যা করেছিলেন। তার মতে, মূলত শব্দটি হচ্ছে ফালাদ্রদ এবং আরবি ভাষায় যাকে বলে আল ফুরাতফালাদ্রুপ শব্দটি এসেছে ফালাদ থেকে এবং ফার্সি ভাষায় যার অর্থ হচ্ছে ‘এর পারে’হামাবি এর কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ ‘ইউফ্রেটিস নদীটি টাইগ্রিসের পরেই অবস্থিত’। 

টাইগ্রিস আবার ইরানের পরে অবস্থান করে। এই কারণেই এর নাম ফালাদ্রদ, যা ফালাদ থেকে এসেছে (ইউফ্রেটিস নদীর কাছে)। এ বিবৃতির পর হামারি একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। মধ্যযুগের আরবের ভূগোলবিদরা ইউফ্রেটিসকে অত্যন্ত গুরুত্ব-মর্যাদা দিয়েছেন। আরবের ভূগোলবিদ হিমায়ারি ইউফ্রেটিস নদীকে বর্ণনা করেছিলেন এবং পৃথিবীর ছয়টি মূল নদীর একটি হিসেবে এই নদীটিকে বর্ণনা করেছেন। 

তার মতামত অনুযায়ী, ইউফ্রেটিস দুনিয়ার দীর্ঘ নদ-নদীগুলোর মধ্যে একটি। অন্যগুলো যেমনঃ নীল নদ, গঙ্গা, আমু দরিয়া, টাইগ্রিস ও চীনের পার্ল রিভার। আরেক জন ভূগোলবিদ এল জুহরি ইউফ্রেটিসকে দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী বলে ব্যাখ্যা করেছেন এবং তার মতামত অনুযায়ী, এটিই দুনিয়ার দীর্ঘতম নদী।

মধ্যযুগের প্রায় সব ভূগোলবিদই ইউফ্রেটিস রেসিন নিয়ে একই রকম অনেক বর্ণনা করেছেন। সবখানেই নদীর উৎস ও সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সাহিপ হুদুদ-ই আলেম বর্ণনা করেছেন, ইউফ্রেটিস নদীর উৎস হলো আলিক পর্বত এবং এ নদী আনাতোলিয়াকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে এবং তার বর্ণনা অনযায়ী, ইউফ্রেটিসের তিনটি শাখার কথা জানা যায় যা হচ্ছেঃ হাবুর নদী, ইসা নদী ও সারসার নদী।

আশা করি উপরোক্ত বর্ণনাকৃত তথ্যসমূহ আপনাদের ভালো লেগেছে। পোস্টটি থেকে আপনি যদি উপকৃত হয়ে থাকেন তাহলে অবশ্যই আপনাদের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং তাদেরকেও এই তথ্যগুলো থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ করে দিন। শেষ পর্যন্ত থাকার জন্য ধন্যবাদ।

Leave a Comment